অধ্যাপক মোঃ রশীদুল হাসানঃ

স্বল্পভাষী, স্থির, অত্যন্ত মেধাবী এবং দেশপ্রেমিক ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ জামাল। অকালপ্রয়াত বাংলাদেশের প্রথম তিনজন কমিশন সেনাকর্মকর্তার একজন ছিলেন এই সাহসী তরুণ। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দ্বিতীয় পুত্র শেখ জামালের জন্ম ১৯৫৪ সালের ২৮ এপ্রিল টুঙ্গী পাড়ায়। শেখ জামাল ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনা ও খেলাধুলার প্রতি অনেক আগ্রহী ছিলেন। অত্যন্ত ভালো ক্রিকেট খেলতেন তিনি। রেসিডেনশিয়াল মডেল ও ঢাকা কলেজের ছাত্র ছিলেন। বিচক্ষণ প্রজ্ঞা এবং স্মৃতিশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বড় হয়ে ওঠা শেখ জামাল বাবার সান্নিধ্য তেমন না পেলেও বঙ্গমাতা ও বড় বোন শেখ হাসিনার সঠিক দীক্ষায় প্রকৃত মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন।

৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে গৃহবন্দী অবস্থায় থাকাকালীন ধানমন্ডির সেই কাঁটাতারের বেড়া ভেদ করে পালিয়ে যান ভারতে এবং বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স মুজিব বাহিনীর ৮০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগদান করেন মুক্তিযুদ্ধে।তার এই ঘটনাটি ছিল সেই সময়ে বেশ আলোচিত। সবাই ধারণা করেন যে শেখ জামালকে পাকিস্তানিরা গুম করেছে। বিভিন্ন বিদেশী পত্রিকায় সেটা প্রকাশিত হলে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী এতে বিচলিত হয়ে পড়ে। মূলত দুটি কারণে শেখ জামালের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের খবরটি গোপন রাখা হয় বলে আমার ধারণা।

১. শেখ জামালের জীবনের ঝুঁকি কমানো

২. এবং পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীকে আরো চাপে রাখা।

অত্যন্ত সাহসী এবং কৌশলে শেখ জামাল বাংলাদেশ স্বাধীনের পর যুদ্ধের ময়দান থেকে ১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর ফিরে আসেন ঢাকায়। গায়ে ছিল সেই যুদ্ধকালীন পোশাক। তার এই ফিরে আসায় আশ্বস্ত হন পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং সবাই। শেখ জামালের সেনাবাহিনীর প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল। ১৯৭৪ সালে ২৯ সে জানুয়ারি মার্শাল টিটো রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকায় আসেন আর শেখ জামালের এই আগ্রহ তাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে। পরবর্তীতে শেখ জামালকে যুগোস্লাভ মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। পরবর্তীতে বৃটেনের রয়েল মিলিটারি একাডেমী থেকে প্রশিক্ষণ নেন শেখ জামাল। বিদেশি ক্যাডেটদের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে কমিশন লাভ করেন মাত্র ৩ জন তার মধ্যে শেখ জামাল অন্যতম।
স্যান্ডহার্স্ট একাডেমী থেকে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে যোগদান করেন ঢাকা সেনানিবাসে এবং কোম্পানি অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।তার কর্ম দক্ষতা এবং অহংকারহীন জীবন যাপনে অতি স্বল্প সময়ে সবার প্রিয় হয়ে ওঠেন শেখ জামাল। সৈনিক থেকে শুরু করে সিনিয়র অফিসার সবার সাথেই তিনি অত্যন্ত মিশুক ছিলেন এবং কর্মদক্ষতার জন্য সবার মধ্যমনি ছিলেন। ১৪ ই আগস্ট রাতে ডিউটি অফিসার হিসেবে সেনানিবাসে যান শেখ জামাল। ডিউটি শেষ হলে একজন সুবেদার বলেছিলেন, “স্যার অনেক রাত হয়েছে আজ ইউনিটে থেকে যান”। শেখ জামাল কি আর থাকেন, মায়ের নির্দেশ বাসায় ফেরার, কার সাধ্য সেই নির্দেশ অমান্য করার? সেই রাত ভোর হতে না হতেই পৃথিবীর জঘন্যতম নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালানো হয় একদল পাকিস্তানপন্থি দেশদ্রোহী সেনাসদস্যের দ্বারা। শহীদ হন জাতির পিতা, বঙ্গমাতা ও বঙ্গবন্ধু পরিবারের অন্যান্য সদস্যগণ। একজন সেনা কর্মকর্তার হত্যার বিচার সেনা আইনেই হবে এটাই ছিল সকলের কাম্য এবং স্বাভাবিক। কিন্তু দুঃখের বিষয় বিচার তো দূরের কথা বিচার চাওয়ার অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হয় সেই কুখ্যাত ইনডেমনিটির মাধ্যমে।

শেখ জামাল তোমার মৃত্যু নাই, আছো তুমি আমাদের সকলের হৃদয়ের গভীরে।

লেখকঃ অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Comment