বঙ্গবন্ধুর গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষা দর্শন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সনদ

 

বঙ্গবন্ধুর গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষা দর্শন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সনদ – Published by Bangladesh Awami League

 

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি উন্নত ও সমৃদ্ধ সোনার বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের শুধু একটি জাতি সত্ত্বাই দেননি, তিনি আমাদের পথ দেখিয়েছেন আগামী প্রযুক্তি নির্ভর সমৃদ্ধ বাংলাদেশের। ধ্বংস্তুপ থেকে বাংলাদেশকে তুলে এনে সম্ভাবনাময় একটি দেশে রূপান্তর করেছেন। আগামীর বাংলাদেশে যে শিক্ষা ছাড়া উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব নয়, তা উপলব্ধি করেই শিক্ষা কে বঙ্গবন্ধু সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যে শিক্ষার রূপরেখা তৈরি করেন ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের মাধ্যমে, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন গঠন করেন, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে স্বায়ত্ত শাসন প্রদান করেন, প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠাসহ নানাবিধ যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন শিল্পের উন্নয়ন শিক্ষার উন্নয়ন ছাড়া সম্ভব নয়। জাতির পিতা তার শিক্ষা ভাবনা ও দর্শন ১৯৭০ সালের নির্বাচনী প্রচারে একাধিকবার, অন্তত ১৩২ টি শিক্ষা সংক্রান্ত ভাবধারা উপস্থাপন করেন (ড. আনু মুহাম্মদ Bangabandhu’s Education Philosophy, ১৮মার্চ ২০১৭)।
তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোঃ

জাতির পিতার শিক্ষাদর্শন ছিল গণমুখী ও সর্বজনীন। বঙ্গবন্ধু শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষাকে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হিসাবে বাংলাদেশের সংবিধানে সংযোজিত করেন। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাকে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫(ক) এ জীবন ধারনের মৌলিক উপকরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

অনুচ্ছেদ-১৭ অনুসারে সর্বজনীন শিক্ষার গুরুত্ব স্পষ্টই প্রতিয়মান হয়।

অনুচ্ছেদ-১৭: অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা।রাষ্ট্র-

ক) একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার জন্য;
খ) সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করিবার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছাপ্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য;
গ) আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করিবার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।

অনুচ্ছেদ-২৮(৩) ও অনুচ্ছেদ -৪১(২) অনুসারে সকল জনগণের শর্তহীন বাধা বিপত্তিহীন, ধর্ম নিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বর্বর পাকিস্তানি সেনা ও তাদের দোসররা ১৮,০০০ প্রাথমিক বিদ্যালয়,৬,০০০ উচ্চ বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা এবং ৯০০ টি কলেজ ধ্বংস করে দেয় (মোহাম্মদ জাকির হোসেন-২০২০, বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনা, পৃষ্টা-৫৭৫)।পক্ষান্তরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুর্নগঠন করেন, ৪০,০০০ প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয় এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১,৫৭,৭৪১ জন শিক্ষকের চাকরী সরকারিকরণ করেন। নতুন ১১,০০০ প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন (ড. জি. এম. ফিরোজ শাহ বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা দর্শন পৃষ্টা-৫২) কলেজের সকল শিক্ষকদের এডহক চাকরী নিয়মিত করা হয়।

বঙ্গবন্ধুর আমলে মানসম্মন্ন গণমুখী এবং সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাহিদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। উপযুক্ত উদ্দেশ্য অর্জনে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কতগুলো কৌশলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।যথা-

  • অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থীরা যাতে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, প্রয়োজনে শিক্ষালয়গুলোতে দু’শিফটের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের সংখ্যা বৃদ্ধি করে প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থীকে মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ দিতে হবে।
  • বিজ্ঞান শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আবশ্যক।
  • স্কুল সংলগ্ন ল্যাবেরেটরী এবং বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান সংলগ্ন ওয়ার্কশপে বয়সভেদে বিভিন্ন ব্যক্তিদের নানামুখী প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
  • মেধা যোগ্যতার ভিত্তিতে মনোনীত শিক্ষার্থীরাই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করবে।দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিশেষজ্ঞ তৈরি করবে।
  • বয়স্ক শিক্ষা প্রসারে রেডিও,টেলিভিশন,মাধ্যমিক ও কলেজ শিক্ষার্থীদের কাজে লাগাতে হবে।
  • প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহপাঠক্রমিক কর্মকান্ড ব্যপকভাবে প্রসার করে শিক্ষালয়ের অভ্যন্তরে ও বাহিরে খেলাধুলা, ক্রীড়া প্রতিযোগীতা ও সংস্কৃতি কর্মকান্ডে উৎসাহ প্রদান করতে হবে।
  • মেয়েদের শিক্ষা প্রসারে গুরুত্বদিয়ে প্রথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থা করা হবে।

শিক্ষা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিবিড়ভাবে অনুধাবন করেছেন বঙ্গবন্ধু। শিক্ষকদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর শ্রদ্ধাবোধ এখনও অনুকরণীয় । অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও কারাগারের রোজনামচায় শিক্ষা ও শিক্ষকদের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে অনেকবার । স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা সচিব বানিয়েছেন যোগ্য শিক্ষকদের মধ্যে থেকেই । বিভিন্ন সময় বঙ্গবন্ধুর ভাষণে শিক্ষার গুরুত্ব ও শিক্ষা শিক্ষা হওয়া উচিত এ বিষয় গুলো ফুটে উঠেছে। ১৯৭৪ সালে মহিলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেন,

“…. ক খ শিখলেই শিক্ষিত হয় না, সত্যিকার আলোকপ্রাপ্ত হইতে হবে”।

মোনায়েম সরকার সম্পাদিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহ্মানঃ জীবন ও রাজনীতি বইয়ের পৃষ্ঠা-৯০৪ ও ৯২০থেকে জানা যায়, বঙ্গবন্ধু বলেন

“… ছাত্র সমাজের লেখা পড়া করতে হবে। লেখা পড়া করে মানুষ হতে হবে।

জনগণ টাকা দেয়, ছাত্রগণকে মানুষ হবার জন্য।

মানুষ হতে হবে – আমরা যেন পশু না হই।

লেখাপড়া শিখে আমরা যেন মানুষ হই ।”

মিজানুর রহমান মিজান সম্পাদিত “বঙ্গবন্ধু ভাষন” পৃষ্ঠা ১১৫ ও ১১৭ থেকে জানা যায়, পড়াশুনার পাশাপাশি ছাত্র/ছাত্রীদের আত্মকর্মসংস্থান ও বাড়ির অন্য কাজেও মনোযোগী হওয়ার তাগিদ দেন।

বঙ্গবন্ধু বলেন, “আর লেখাপড়া শিখে যে সময় টুকু থাকে বাবা-মা কে সাহায্য কর।  কোদাল মারতে লজ্জা কোরো না।  দুনিয়ার দিকে চেয়ে দেখ।  কানাডায় দেখলাম ছাত্ররা ছুটির সময় লিফট চালায়।  ছুটির সময় দুপয়সা উপার্জন করতে চায়।  আর আমাদের ছেলেরা কত আরামে খান আর তাস নিয়ে ফটাফট খেলতে বসে পড়েন।  গ্রামে গ্রামে বাড়ির পাশে বেগুন গাছ লাগিওকয়েকটা মরিচ গাছ লাগিওকয়টা লাউ গাছ লাগিওকয়েকটা নারিকেল চারা লাগিও,  বাপ-মারে একটু সাহায্য কর। কয়েকটা মুরগী পালকয়েকটা হাঁস পাল।  জাতীয় সম্পদ বাড়বেতোমার খরচ তুমি বহন করতে পারবে।  বাবার কাছ থেকে যদি এত টুকু জমি নিয়ে ১০ টা লাউ গাছ৫০ টা মরিচ গাছকয়েকটা নারিকেল গাছ লাগিয়ে দাও, দেখবে শত শত টাকা আয় হয়ে যাবে।”

গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থা যে যথেষ্ট না, প্রায়োগিক ও প্রযুক্তি শিক্ষা অত্যন্ত প্রয়োজন, সেটা জাতির পিতা সেই সময়েই বুঝতে পেরেছিলেন। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা ছিল খুব পরিষ্কার, তিনি উল্লেখ করেন,

“…..শুধু বিএ, এম এ পাস করে লাভ নাই। আমি চাই কৃষি কলেজ, কৃষি স্কুল, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও স্কুলে যাতে সত্যিকার মানুষ পয়দা হয়। বুনিয়াদি শিক্ষা নিলে কাজ করে খেয়ে বাঁচতে পারবে। কেরানী পয়দা করেই একবার ইংরেজ শেষ করে গেছে দেশটা। তোমাদের মানুষ হতে হবে ।”

মানবসম্পদ উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু ছিলেন প্রকৃত দিক নির্দেশনা প্রদানকারী। বই ও পত্রিকা ছিল তার নিত্যসংগী। তাই তিনি বিশ্ব অর্থনীতি, ও তার গতিবিধি বুঝতেন, বুঝতেন বাংলাকে সোনার বাংলায় রূপ দিতে হলে তাত্ত্বিক শিক্ষায় কোনো লাভ নেই। তাই তিনি বাস্তবধর্মী ও সুদূরপ্রসারী শিক্ষা কর্মসূচি গ্রহন করেন।

লেখকঃ অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

You may also like...